শেষ আটের মহাযুদ্ধ: আর্জেন্টিনার টানা রোমাঞ্চ বনাম ফ্রান্স-ইংল্যান্ডের দাপট, শীর্ষে কারা?

আমরা এখন বিশ্বকাপের প্রায় অন্তিম লগ্নে! শেষ আটের লড়াইয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের উত্তেজনা এখন ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো টগবগ করছে। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা প্রতিটি দলের জন্যই এখন বিশ্বকাপের বাজিটা আকাশচুম্বী। আর টুর্নামেন্টের প্রতিটা দিন যেভাবে একের পর এক জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দিয়ে চলেছে, তাতে পরের পর্বের রোমাঞ্চ যে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে, তা বলাই বাহুল্য!
শেষ ষোলোর ম্যাচগুলোতে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিনোদনের কোনো কমতি ছিল না। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের সেই স্নায়ুচাপের জয়, মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার মহাকাব্যিক রূপকথার প্রত্যাবর্তন, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের জালে বেলজিয়ামের গোলবন্যা, সব ম্যাচই ছিল পয়সা উসুল! নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই নরওয়ের হয়ে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দিয়েছেন আর্লিং হালান্ড। তবে স্পেনের কাছে পর্তুগালের অল্পের জন্য হারে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ ছোঁয়ার স্বপ্ন আজীবনের মতো থমকে গেছে! আমরা বিদায় জানিয়েছি ফুটবলের আরেক অবিসংবাদিত বরপুত্রকে।
সুতরাং, আসল লড়াই যখন এবার ঘরের দুয়ারে, আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফিটি কার হাতে উঠছে? বাকি থাকা সেরা আট দলের শক্তিমত্তা বিচার করে, সব বিশ্লেষকের বিচারে একটা র্যাঙ্কিং করে দেখে নেয়া যাক কারা এগিয়ে এই বিশ্বজয়ের দৌড়ে।
৮. বেলজিয়াম
একেবারে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে টুর্নামেন্টে নিজেদের চেনা রূপে ফেরার এক অবিশ্বাস্য গল্প লিখেছে বেলজিয়াম! গ্রুপ পর্বে ধুঁকতে ধুঁকতে কোনোমতে পার হওয়া, এরপর শেষ বত্রিশের ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে খেলার শেষ ৪ মিনিট বাকি থাকা পর্যন্তও ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা, এমন এক ধ্বংসস্তূপ থেকে বেলজিয়াম আজ কোয়ার্টার ফাইনালে! ঠিক শেষ মুহূর্তে যেন তারা নিজেদের হারিয়ে যাওয়া চেনা ছন্দ খুঁজে পেয়েছে।
সেনেগালের বিপক্ষে সেই রূপকথার মতো ঘুরে দাঁড়ানোর পর, 'রেড ডেভিল'রা তাদের আসল রূপটা জমিয়ে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। মার্কিনদের টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করার ম্যাচে তারা এই মৌসুমের সেরা ফুটবলটাই খেলে দেখালো। আর এর পুরো কৃতিত্ব কোচ রুডি গার্সিয়ার। কেভিন ডি ব্রুইনা আর জেরেমি ডকুর মতো মহাতারকাদের বেঞ্চে বসিয়ে রাখার যে সাহসী জুয়া তিনি খেলেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত দারুণভাবে কাজে লেগেছে। অন্যদিকে, রোমেলু লুকাকুকে যখন কেবল ম্যাচের শেষ দিকে কিছুক্ষণের জন্য নামানো হচ্ছে, তখন চার্লস ডি কেটেলিয়ার অবশেষে প্রমাণ করে দিলেন যে বেলজিয়ামের আক্রমণভাগের হাল ধরার আসল মরণাস্ত্র তিনিই।
কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের বাধা টপকাতে হলে বেলজিয়ামকে তাদের খেলার ধার আরও অনেক বাড়াতে হবে, তবে এই টুর্নামেন্ট অন্তত একটা কাজের কাজ করেছে। তবে এই টুর্নামেন্ট অন্তত একটা কাজের কাজ করেছে দলটি। বেলজিয়ামের ফুটবল নিয়ে সমর্থকরা যে আশা একরকম ছেড়েই দিয়েছিল, তা আবারও নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে তার কোন সন্দেহ নেই।
৭. সুইজারল্যান্ড
ম্যাচটা দেখতে যে খুব একটা চোখজুড়ানো ছিল না। এটাও না যে ভ্যাঙ্কুভারে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ড আর কলম্বিয়া যখন মুখোমুখি হয়েছিল, তখন ফুটবল-রোমান্টিকরা খুব একটা নান্দনিক ম্যাচের আশাও করেছি। দুই দলই এই পর্যন্ত এসেছে বেশ রক্ষণাত্মক ও হিসেবি ফুটবল খেলে। জাদুকরী কিছু দুই দলে কেউ দেখাতে পারে নাই। তাই একটা ম্যাড়মেড়ে আর বিরক্তিকর ম্যাচের ভাগ্য শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে নির্ধারণ হওয়াটা মোটেও আশ্চর্যের ছিল না।
তবে ইনজুরির কারণে দলের অন্যতম সেরা আবিষ্কার জোহান মানজাম্বিকে ছাড়া মাঠে নেমেও জয়ের পথ খুঁজে নেওয়ার জন্য সুইসদের কৃতিত্ব দিতেই হবে। এমনকি টাইব্রেকারের নায়ক রুবেন ভার্গাসও পুরোপুরি ফিট না থাকায় কেবল ম্যাচের শেষ দিকে বদলি হিসেবে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই, শেষ আটের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সুইজারল্যান্ডকে অনেকটাই আন্ডারডগ বা দুর্বল দল হিসেবে ধরা হচ্ছে। তবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা তাদের শেষ দুই ম্যাচে যেভাবে ধুঁকেছে, তা সুইসদের মনে অসাধ্য সাধনের এক নতুন আত্মবিশ্বাস জোগাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
৬. মরক্কো
এমনটা হয়তো মনে হওয়ার কোন কারণ নেই যে, শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মরক্কোর চেয়ে কানাডাই ভালো দল ছিল । জেসি মার্শ, এই মার্কিন কোচ যে বরাবরের মতোই বানোয়াট কথা বলছেন, তা বলাই বাহুল্য। ‘দ্য কানাক্স’ নিঃসন্দেহে ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’ কে বেশ ভালোই ভুগিয়েছে, তবে দিনশেষে ম্যাচ জয়ের শতভাগ যোগ্য দাবিদার মরক্কোই ছিল। যদিও ৩-০ ব্যবধানের জয়টি তাদের মাঠের পারফরম্যান্সের তুলনায় একটু বেশিই বড় মনে হতে পারে।
গত বিশ্বকাপে চতুর্থ হওয়া মরক্কোর সামনে এবার সেই প্রতিপক্ষ, যারা কাতারে তাদের স্বপ্নের দৌড় থামিয়ে দিয়েছিল ফ্রান্স। আর বর্তমান ফরাসি দলটিকে সেবারের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও নিখুঁত দেখাচ্ছে। অবশ্য মরক্কোও হাত গুটিয়ে বসে নেই, বিশেষ করে তাদের আক্রমণভাগের ধার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। যেহেতু এবার হারানোর কিছুই নেই, তাই ফরাসীদের বিপক্ষে প্রতিশোধের এই মোক্ষম সুযোগটি লুফে নিতে তারা নিশ্চয়ই মনে প্রাণে মুখিয়ে থাকবে।
৫. নরওয়ে
২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের চেয়ে বেশি আনন্দ আর কোন দল উপভোগ করছে?! শেষ ষোলোতে ব্রাজিলের মুখোমুখি হওয়ার আগেই প্রায় সবাই বলেছিলাম, এই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দলটি সেলেসাওদের জন্য এক দুঃস্বপ্নের নাম হতে যাচ্ছে। কারণ ১৯৯৮ সালের পর নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে এসে গ্রুপ পর্ব পার হওয়ার মূল লক্ষ্যটা তারা আগেই পূরণ করে ফেলেছিল, ফলে কোনো চাপ ছাড়াই একদম মুক্ত মনে খেলছিল তারা।
প্রায় সব ফুটবল বিশ্লেষক এটাও মনে করিয়ে দিয়েছিলো যে, তাদের দলে আর্লিং হালান্ডের মতো এমন একজন বিধ্বংসী ‘ওয়ান-ম্যান আর্মি’ আছে, যে বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল ব্যাক জুটিকেও একাই গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। এবং ইস্ট রাদারফোর্ডে ঠিক তাই ঘটল! মুখে চওড়া হাসি নিয়ে এই খুনী স্ট্রাইকার করলেন জোড়া গোল! শেষ আটের লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও নরওয়েকে খাতা কলমে পিছিয়ে রাখা হবে, তবে এই আন্ডারডগ তকমাটা তাদের দারুণ পছন্দ। কারণ সব চাপ তো আবারও সেই প্রতিপক্ষের ওপরেই থাকবে!
৪. আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনা কি আসলেই ভাগ্যবান, নাকি চরম ভাবে ঘুরে দাঁড়াতে জানা এক দল? সম্ভবত দুটোরই একটা মিশ্রণ। কারণ আটলান্টায় শেষ ষোলোর সেই স্মরণীয় ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে ভাগ্য দেবী নিশ্চিত ভাবেই লিওনেল স্কালোনির দলের দিকে হেসেছিলেন। তবে ম্যাচের মাত্র ১১ মিনিট বাকি থাকতেও ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর, যেভাবে তারা ফারাওদের ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে মাঠ ছেড়েছে, সেই অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের জন্য তারা বিশাল প্রশংসার দাবিদার।
যথারীতি এই ঘুরে দাঁড়ানোর মূল নায়ক ছিলেন লিওনেল মেসি। ম্যাচে আরও একটি পেনাল্টি মিসের খেসারত তিনি চড়া সুদে উসুল করেছেন। প্রথমে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে দিয়ে একটি গোল করিয়েছেন এবং পরে নিজেই করেছেন এক গোল। আর সবশেষে, ইনজুরি টাইমে লাউতারো মার্টিনেজের ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজের বুলেট হেড জয় নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেদের।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনারই জেতার কথা। কিন্তু কেপ ভার্দে এবং মিশরের মতো দলের বিপক্ষে যেভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তারা পার পেল, তাতে শেষ আটের লড়াইয়ে এসে এই বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ভাগ্যের চাকা উল্টো ঘুরে যাবে না তো?
৩. ইংল্যান্ড
চলতি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েই অবশেষে টমাস টুখেলের শিষ্যরা তাদের সেরা রূপটি মেলে ধরল। মেক্সিকোর ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের হারিয়ে তারা যে ফুটবলীয় মান আর চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখিয়েছে, তা একথাই প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে কুখ্যাত শিরোপা খরাটি এবার সত্যিই ঘুচিয়ে দিতে পারে থ্রি লায়ন্সরা।
মেক্সিকোর বিপক্ষে রোমাঞ্চে ঠাসা ৩-২ ব্যবধানের জয়ে রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার জুড বেলিংহাম ছিলেন এক কথায় অনবদ্য। তবে মেক্সিকো সিটির সেই ম্যাচে একক কোনো নৈপুণ্যের ওপর ভর না করে দুর্দান্ত একটা দলীয় পারফরম্যান্স দেখিয়েছে ইংল্যান্ড, যা কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের মুখোমুখি হওয়ার আগে এই দলের আত্মবিশ্বাসকে আকাশচুম্বী করে দেবে। এটা নিশ্চিত যে, নরওয়ের আর্লিং হালান্ড তাদের সেমিফাইনালের স্বপ্নের পথে কতটা বড় হুমকি। এবং এটি ইংল্যান্ড শিবিরের কাউকে নতুন করে বুঝিয়ে দিতে হবে না নিশ্চয়। তবে টুখেল ভালো করেই জানেন, তাঁর দল যদি হালান্ডের কাছে বল পৌঁছানোর লাইনটা কেটে দিতে পারে, তবে বাকি কাজটা জুড বেলিংহাম আর হ্যারি কেইন একাই সেরে নিতে পারবেন।
২. স্পেন
রাউন্ড অফ বত্রিশের ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে যেভাবে স্পেন উড়িয়ে দিয়েছিল, সোমবার পর্তুগালের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম বড় পরীক্ষায় হয়তো তারা সেই চেনা ছন্দে ফিরতে পারেনি। তবে দিনশেষে আসল কাজটা কিন্তু ঠিকই সেরেছে তারা। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে মিকেল মেরিনোর সেই গোলই পর্তুগালকে বিদায় করে দেয়। আর এই জয়ের হাত ধরেই ২০২৪ সালের ইউরো জয়ের পর এবার বিশ্বজয়ের ট্র্যাকেও দারুণভাবে ছুটছে 'লা রোহা'রা।।
মাঠে বেশ কিছু ঝলক দেখালেও, লামিন ইয়ামালকে ঘিরে ফুটবল বিশ্বকাপের টুর্নামেন্ট শুরুর আগে যতটা উন্মাদনার আশা করেছিল, এখনো ঠিক ততটা জ্বলে উঠতে পারেননি ইয়ামাল। তবে কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম দলটির খেলায় যেমন উন্নতি দেখা যাচ্ছে, তেমনি তাদের রক্ষণভাগেও রয়েছে বেশ কিছু দুর্বলতা। আগামী শুক্রবারের মহাযুদ্ধের আগে স্পেনের এই তরুণ সুপারস্টারের নিজের চেনা রূপ ফিরে পাওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো মঞ্চ আর কি বা হতে পারে?
১. ফ্রান্স
প্যারাগুয়ে সবদিক থেকেই ফ্রান্সকে কোণঠাসা করার এবং অঘটন ঘটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল; কিন্তু শেষ হাসিটা কিলিয়ান এমবাপেই হেসেছেন, তাও আবার আক্ষরিক অর্থে, পেনাল্টি থেকে ম্যাচের একমাত্র জয়সূচক গোলটি করে। ম্যাচ শেষে এমবাপে নিজেই যেমনটা মনে করিয়ে দিলেন প্রতিপক্ষের এমন রুক্ষ ও আক্রমণাত্মক ফুটবল ফ্রান্সকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারেনি। কারণ দলটি যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মত শক্ত ধাতুতে গড়া।
কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে বিদায় করতে হলে ফ্রান্সকে নিঃসন্দেহে তাদের চিরচেনা সেই বিধ্বংসী রূপে ফিরতে হবে। তবে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটিতে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা এটিও প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ম্যাচ দেখতে সুন্দর না হলেও কেবল কৌশলের জোরে কীভাবে জয় ছিনিয়ে আনতে হয় তা এই দলটা ভালো করেই জানে। আর ঠিক এই কারণেই, এবারের বিশ্বকাপ জয়ের প্রধান দাবিদার হিসেবে তারা এখনো সবার ওপরে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে ফ্রান্স।
জনগণের মতামত0
মন্তব্য করতে বা মতামত দেখতে আপনাকে অবশ্যই একাউন্টে লগইন করতে হবে।


